সাদা জার্সির অলিখিত প্রেমগাথা: বাংলাদেশী নারীদের মাদ্রিদিস্তা হয়ে ওঠার গল্প

Sifat Jasim
Wed, Jul 1, 2026

সাদা জার্সির এই গল্পগুলো প্রমাণ করে, ফুটবল শুধু ছেলেদের নয়; ফুটবল মানে মধ্যরাতের নীরবতায় কাঁথা মুড়ি দিয়ে প্রিয় ক্লাবের জন্য প্রার্থনা করা, ফুটবল মানে রামোসের হেডে সব নিয়ম ভেঙে চিৎকার করে ওঠা, ফুটবল মানে—Hala Madrid Y Nada Más!
ফুটবল মানেই এক অন্যরকম উন্মাদনা, এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ। আর যখন সেই ফুটবলের সাথে জড়িয়ে যায় 'রেয়াল মাদ্রিদ' নামটি, তখন সাদা জার্সির প্রতি ভালোবাসা রূপ নেয় এক চিরন্তন আবেগে। আমাদের সমাজে সাধারণত ফুটবলকে ছেলেদের খেলা হিসেবেই দেখা হয়, কিন্তু এই চেনা বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে একঝাঁক বাংলাদেশী তরুণী প্রমাণ করেছেন—মাদ্রিদিজম কোনো লিঙ্গভেদে সীমাবদ্ধ নয়। পেনিয়া মাদ্রিদিস্তা বাংলাদেশের নারী সমর্থকদের এই গল্পগুলো যেন একেকটি ভালোবাসার উপাখ্যান।
শুরুর সেই ম্যাজিক: যেভাবে হলো পরিচয়
কারো শুরুটা হয়েছিল বড় ভাইয়ের সাথে ডিশ ছাড়া টেলিভিশনের সামনে বসে, কারো বা পেপারের পাতায় গ্যালাক্টিকোসদের খবর পড়ে। নাজমুন নাহার মৌমিতার ফুটবল প্রেম শুরু ২০০২ বিশ্বকাপের সময় থেকে। তখন বাসায় ডিশ বা ইন্টারনেট ছিল না। বিশ্বকাপের পর ব্রাজিলের রোনালদো নাজারিও যখন রেয়াল মাদ্রিদে যোগ দিলেন, তখন থেকেই শুরু। দুই-একদিন পর পেপারের পাতায় ২০০২-০৩ সিজনের লা লিগা টাইটেল, লা নভেনা, রাউল, বেকহাম, জিদান ও ক্যাসিয়াসের মতো তারকাদের খবর পড়তে পড়তেই কখন যে এই ক্লাবটির প্রতি ভালোবাসা নেশায় পরিণত হয়েছিল, তা মৌমিতা নিজেও টের পাননি।
একইভাবে ব্রাজিলের কিংবদন্তি রিকার্দো কাকার জাদুতে মজে মাদ্রিদিস্তা হয়েছিলেন অনেকেই। অনিকা বুশরা ইমাম ২০১০ বিশ্বকাপে কাকার সেই লাল কার্ড দেখে কেঁদে ভাসিয়েছিলেন। পরে বড় ভাইয়ের মুখে শুনলেন কাকা খেলেন রেয়াল মাদ্রিদে—ব্যস, সেই থেকেই তিনি অল-হোয়াইটসদের ভক্ত। শেহরীন আবেদ ২০০৯ সালের কনফেডারেশনস কাপে গোল্ডেন বল জেতা কাকার খেলা দেখে মুগ্ধ হয়ে খোঁজ নেন তার বর্তমান ক্লাবের। যখন জানলেন বিশ্বরেকর্ড গড়ে কাকা মাদ্রিদে এসেছেন, তখন থেকেই শুরু হলো তার চিরদিনের পথচলা।
আবার আশরাফুন্নেসা তামান্না বড় ভাইদের রুমে বেকহাম ও নাজারিওর পোস্টার এবং পেপসির বোতলে কাকার কার্ড জমিয়ে জমিয়ে কখন যেন ভালোবেসে ফেলেন এই ক্লাবকে। অনন্যা রহমান ভালোবেসেছিলেন মার্সেলোকে, আর সুমাইয়া তাসনীম ২০০৮ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ভক্ত হয়ে পা বাড়িয়েছিলেন রেয়ালের সোনালী ইতিহাসে। নুসরাত মুনীর পাকাপোক্ত ফ্যান হয়েছিলেন রোনালদো লিমা, জিদান ও কার্লোসদের দেখে। অন্যদিকে, জান্নাতুন নাঈম এর গল্পটা একটু ভিন্ন ও মজার—কাতালান ক্লাব বার্সেলোনাকে দুই চোখে দেখতে না পারার জেদ থেকেই অল-হোয়াইটসদের প্রতি তার নিখাদ ভালোবাসার জন্ম!
৯২:৪৮ এবং লা ডেসিমার সেই অবিস্মরণীয় রাত
সব মাদ্রিদিস্তার জীবনের সবচেয়ে বড় এবং আবেগময় রাতের নাম—La Décima (লা ডেসিমা)। ২০১৪ সালের সেই চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালের কথা মনে করলে আজও এই মেয়েদের গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়।
অনিকা বুশরা ইমাম শেয়ার করেন সেই রাতের এক রোমাঞ্চকর ঘটনা,
"পরের দিন ছিল আমার পরীক্ষা। অনেক কষ্টে আম্মুকে ম্যানেজ করেছিলাম এই শর্তে যে, রাতে খেলা দেখব কিন্তু কোনো চিল্লাচিল্লি করা যাবে না। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে যখন মদ্রিচ কর্নার নিতে যাচ্ছে, আমার হার্টবিট যেন বন্ধ হয়ে আসছিল। রামোসের সেই ৯২:৪৮ মিনিটের অলৌকিক গোলের পর নিজেকে আর আটকে রাখতে পারিনি। নিজের সর্বস্ব দিয়ে চিৎকার করে উঠেছিলাম! আম্মু তো রেগে মারতে এসেছিল, কিন্তু আমি এত খুশি ছিলাম যে একটা মারও গায়ে লাগেনি। এমনকি বিল্ডিংয়ের কয়েকজন কমপ্লেইনও করেছিল, কিন্তু আমার কোনো আফসোস নেই!"
আশরাফুন্নেসা তামান্না এর কাছেও ৯২:৪৮ মিনিটটি জীবনের সবচেয়ে মধুর স্মৃতি। তবে ২০১৭ সালের ইউসিএল ফাইনালে জুভেন্টাসকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ব্যাক-টু-ব্যাক শিরোপা ধরে রাখার রাতে আনন্দের আতিশয্যে কেঁদে ফেলেছিলেন তিনি। অপর্না কর্মকার ও নুসরাত মুনীর এর কাছেও লা ডেসিমা জেতার রাতটি ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে আনন্দঘন ও ঐতিহাসিক এক মুহূর্ত।
কাঁথা মুড়ি দিয়ে খেলা দেখা আর ক্যাম্পাসের 'রিয়াল মাদ্রিদ'
মেয়েদের জন্য রাত জেগে ফুটবল ম্যাচ দেখা এ দেশে কখনোই সহজ ছিল না। বাবা-মায়ের বকুনি, সকালের ক্লাস বা পরীক্ষার চাপ সামলে রেয়ালের ম্যাচ দেখা ছিল এক রোমাঞ্চকর যুদ্ধ।
আশরাফুন্নেসা তামান্না বলেন,
"আমি আম্মুর সাথে ঘুমাতাম। তাই শুরুর দিকে টিভি বা পিসিতে ম্যাচ দেখার সুযোগ ছিল না। সারাজীবন কাঁথা মুড়ি দিয়ে ফোনেই রিয়ালের ম্যাচ শেষ করেছি। কতবার ধরা খেয়ে বকা খেয়েছি তার হিসাব নেই। যখন দল খারাপ খেলত, কান্না করতাম। বাবা এসে আবার খেপিয়ে দিয়ে বলতেন, 'থাক, কান্না করিস না আর!' এই হাসি-কান্না আর খুনসুটির মধ্য দিয়েই মাদ্রিদকে ভালোবেসে যাচ্ছি।"
সুমাইয়া তাসনীম যখন ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রী, তখন সকাল ৮টায় ক্লাস থাকা সত্ত্বেও আব্বু-আম্মুর চোখ ফাঁকি দিয়ে রাত জেগে খেলা দেখতেন। আর ক্যাম্পাসে মাদ্রিদিস্তা হওয়ার অভিজ্ঞতা দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন নাজমুন নাহার মৌমিতা,
"ডিপার্টমেন্টে শিক্ষক থেকে শুরু করে সিনিয়র-জুনিয়র সবাই আমাকে একনামে চিনত। অনেকে ডাকত—'এই রিয়াল মাদ্রিদ, দাঁড়াও!' রাতে ক্লাব ভালো খেললে সকালে করিডোর দিয়ে খুব ভাব নিয়ে হাঁটতাম। আবার খারাপ খেলার পরদিন সবাই রেডি থাকত আমাকে পচানি দেওয়ার জন্য। এই স্মৃতিগুলো আসলেই অমূল্য।"
ফুটবল নিয়ে বন্ধুদের সাথে খুনসুটিও কম নয়। অপর্না কর্মকার জানান, তার বেস্ট ফ্রেন্ড একজন বার্সা ফ্যান। মাদ্রিদকে নিয়ে বান্ধবীর ট্রোল তিনি নিতে পারেন না, আবার বার্সাকে নিয়ে তার ট্রোল বান্ধবী সহ্য করতে পারে না—এই ফুটবলীয় দ্বন্দ্বের কারণে বান্ধবীটি এখনও তার ফ্রেন্ডলিস্টের বাইরে!
শেষ কথা: একটি চিরন্তন বিশ্বাস
বর্তমানে রিয়াল মাদ্রিদ ট্রানজিশন পিরিয়ডের মধ্য দিয়ে গেলেও এই নারী সমর্থকদের বিশ্বাস অটুট। ক্রুস, মদ্রিচ, রামোস বা বেনজেমার মতো কিংবদন্তিরা চলে গেলেও ক্লাবটির 'মাদ্রিদিজম' এবং 'Win or Win' মানসিকতা সবসময় তাদের অনুপ্রাণিত করে। পেনিয়া মাদ্রিদিস্তা বাংলাদেশের চমৎকার ও সুশৃঙ্খল পরিবেশের প্রশংসা করে তারা আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে এই কমিউনিটি আরও বড় হবে এবং বাংলাদেশে নারীদের ফুটবল উন্মাদনাকে আরও বেশি বেগবান করবে।
সাদা জার্সির এই গল্পগুলো প্রমাণ করে, ফুটবল শুধু ছেলেদের নয়; ফুটবল মানে মধ্যরাতের নীরবতায় কাঁথা মুড়ি দিয়ে প্রিয় ক্লাবের জন্য প্রার্থনা করা, ফুটবল মানে রামোসের হেডে সব নিয়ম ভেঙে চিৎকার করে ওঠা, ফুটবল মানে—Hala Madrid Y Nada Más!

আলোচনা
কমিউনিটির সাথে আপনার মতামত শেয়ার করুন
মন্তব্য লোড হচ্ছে…